ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানের পক্ষে বাড়ছে জনসমর্থন, নড়বড়ে জামায়াতের ভোটব্যাংক

289

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংকে তুলনামূলকভাবে অস্থিরতা রয়েছে এবং দলটির একটি অংশের সমর্থক বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের মধ্যেও বিএনপির প্রতি সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, তারেক রহমান ভবিষ্যতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইনোভিশন কনসালটিং তাদের গবেষণা পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (PEPS)–এর তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফল প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জরিপের প্রধান গবেষক ড. রুবাইয়াত সারওয়ার জানান, ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের মনোভাব, ভোট দেওয়ার আগ্রহ এবং নির্বাচন পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতেই এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।

জানুয়ারি মাসের ১৬ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই প্যানেল জরিপটি সম্পন্ন করা হয়। এতে মোট ৫ হাজার ১৪৭টি সফল সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। আগের দুই রাউন্ডে অংশ নেওয়া ২০ হাজার ৮০ জন উত্তরদাতার কাঠামো থেকে স্তরভিত্তিক র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে নমুনা নির্বাচন করা হয়। সারা দেশের ৫০০টি প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। চূড়ান্ত নমুনা নিশ্চিত করতে ১৫ হাজার ৬৪৯টি ফোনকল করা হলেও অংশগ্রহণে অনাগ্রহ বা যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় প্রায় ৬৮ শতাংশ ঝরে পড়ে। তথ্য সংগ্রহে কম্পিউটার সহায়তায় টেলিফোন সাক্ষাৎকার (CATI) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এবং জাতীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ২০২২ সালের জনশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-সার্ভে ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে।

জরিপের তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে বিএনপি তাদের মূল সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি আগের রাউন্ডে জামায়াত বা এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছিলেন—এমন কিছু ভোটারের সমর্থনও অর্জন করেছে। যদিও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে উভয় দিকেই কিছু ভোট স্থানান্তর হয়েছে, মোট হিসাবে পরিবর্তন জামায়াতের ক্ষেত্রেই বেশি, যা তাদের সামগ্রিক ভোটভাগে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি জামায়াত ও এনসিপির জোটের কারণে এনসিপির কিছু ভোট বিএনপির দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়, বিএনপির তুলনায় জামায়াতের ভোটব্যাংক বেশি অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।

সম্ভাব্য ভোটের হিসাবে দেখা গেছে, বিএনপি ও তাদের জোট প্রায় ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেতে পারে, অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের জোট পেতে পারে আনুমানিক ৩১ শতাংশ। বিএনপির সম্ভাব্য ভোটের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে সিদ্ধান্তহীন বা অনির্ধারিত ভোটারদের কাছ থেকে, যেখানে জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সিদ্ধান্তহীন ভোটার বিএনপির প্রতি ঝুঁকেছেন।

আগামীকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নিজ নিজ এলাকায় বিএনপির প্রার্থী জয়ী হতে পারেন বলে মনে করেন ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা, আর ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ এ বিষয়ে অনিশ্চিত। আগের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন, ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেননি।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী। ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে এবং ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা, যা আগের রাউন্ডের তুলনায় বেশি।

ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন। ২২ দশমিক ৫ শতাংশ শফিকুর রহমানের নাম বলেছেন এবং ২ দশমিক ৭ শতাংশ নাহিদ ইসলামকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এখনও নিশ্চিত নন।

জরিপের উপসংহারে বলা হয়েছে, ভোটব্যাংকে এখনও অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং প্রচারণা কৌশল ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে বিএনপি ও জামায়াত জোটের ব্যবধান কমতেও পারে, আবার বাড়তেও পারে, যা শেষ পর্যন্ত আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে।

ইনোভিশন কনসালটিং একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক, ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জরিপটির অর্থায়ন, নকশা ও বাস্তবায়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। আউটরিচ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে BRAIN এবং Voices for Reform; তৃতীয় রাউন্ড যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে এই দুই সংস্থা।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ এম. শাহান, Voices for Reform–এর যুগ্ম আহ্বায়ক ফাহিমা খাতুন, BRAIN–এর নির্বাহী পরিচালক শফিকুল রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ্যোতি রহমান এবং ইনোভিশন কনসালটিংয়ের পোর্টফোলিও ডিরেক্টর তাসমিয়া রহমান বক্তব্য দেন।

ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

যানবাহনে জ্বালানি তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিলো সরকার

তারেক রহমানের পক্ষে বাড়ছে জনসমর্থন, নড়বড়ে জামায়াতের ভোটব্যাংক

আপডেট সময় ০৭:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
289

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংকে তুলনামূলকভাবে অস্থিরতা রয়েছে এবং দলটির একটি অংশের সমর্থক বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের মধ্যেও বিএনপির প্রতি সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, তারেক রহমান ভবিষ্যতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইনোভিশন কনসালটিং তাদের গবেষণা পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (PEPS)–এর তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফল প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জরিপের প্রধান গবেষক ড. রুবাইয়াত সারওয়ার জানান, ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের মনোভাব, ভোট দেওয়ার আগ্রহ এবং নির্বাচন পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতেই এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।

জানুয়ারি মাসের ১৬ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই প্যানেল জরিপটি সম্পন্ন করা হয়। এতে মোট ৫ হাজার ১৪৭টি সফল সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। আগের দুই রাউন্ডে অংশ নেওয়া ২০ হাজার ৮০ জন উত্তরদাতার কাঠামো থেকে স্তরভিত্তিক র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে নমুনা নির্বাচন করা হয়। সারা দেশের ৫০০টি প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। চূড়ান্ত নমুনা নিশ্চিত করতে ১৫ হাজার ৬৪৯টি ফোনকল করা হলেও অংশগ্রহণে অনাগ্রহ বা যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় প্রায় ৬৮ শতাংশ ঝরে পড়ে। তথ্য সংগ্রহে কম্পিউটার সহায়তায় টেলিফোন সাক্ষাৎকার (CATI) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এবং জাতীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ২০২২ সালের জনশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-সার্ভে ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে।

জরিপের তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে বিএনপি তাদের মূল সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি আগের রাউন্ডে জামায়াত বা এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছিলেন—এমন কিছু ভোটারের সমর্থনও অর্জন করেছে। যদিও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে উভয় দিকেই কিছু ভোট স্থানান্তর হয়েছে, মোট হিসাবে পরিবর্তন জামায়াতের ক্ষেত্রেই বেশি, যা তাদের সামগ্রিক ভোটভাগে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি জামায়াত ও এনসিপির জোটের কারণে এনসিপির কিছু ভোট বিএনপির দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়, বিএনপির তুলনায় জামায়াতের ভোটব্যাংক বেশি অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।

সম্ভাব্য ভোটের হিসাবে দেখা গেছে, বিএনপি ও তাদের জোট প্রায় ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেতে পারে, অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের জোট পেতে পারে আনুমানিক ৩১ শতাংশ। বিএনপির সম্ভাব্য ভোটের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে সিদ্ধান্তহীন বা অনির্ধারিত ভোটারদের কাছ থেকে, যেখানে জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সিদ্ধান্তহীন ভোটার বিএনপির প্রতি ঝুঁকেছেন।

আগামীকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নিজ নিজ এলাকায় বিএনপির প্রার্থী জয়ী হতে পারেন বলে মনে করেন ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা, আর ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ এ বিষয়ে অনিশ্চিত। আগের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন, ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেননি।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী। ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে এবং ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা, যা আগের রাউন্ডের তুলনায় বেশি।

ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন। ২২ দশমিক ৫ শতাংশ শফিকুর রহমানের নাম বলেছেন এবং ২ দশমিক ৭ শতাংশ নাহিদ ইসলামকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এখনও নিশ্চিত নন।

জরিপের উপসংহারে বলা হয়েছে, ভোটব্যাংকে এখনও অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং প্রচারণা কৌশল ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে বিএনপি ও জামায়াত জোটের ব্যবধান কমতেও পারে, আবার বাড়তেও পারে, যা শেষ পর্যন্ত আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে।

ইনোভিশন কনসালটিং একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক, ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জরিপটির অর্থায়ন, নকশা ও বাস্তবায়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। আউটরিচ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে BRAIN এবং Voices for Reform; তৃতীয় রাউন্ড যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে এই দুই সংস্থা।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ এম. শাহান, Voices for Reform–এর যুগ্ম আহ্বায়ক ফাহিমা খাতুন, BRAIN–এর নির্বাহী পরিচালক শফিকুল রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ্যোতি রহমান এবং ইনোভিশন কনসালটিংয়ের পোর্টফোলিও ডিরেক্টর তাসমিয়া রহমান বক্তব্য দেন।