বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৭৯ বছরে পা রেখেছেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার একটি মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। প্রবীণ এই রাজনীতিকের জন্মদিন উপলক্ষে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়ে তার সুস্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক সাফল্য কামনা করেন।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১টা ২২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি লেখেন, জন্মদিনে সবার ভালোবাসায় তিনি আপ্লুত ও কৃতজ্ঞ।
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনীতি শুরু করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। সে সময়ের কথা আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগের। স্বাধীন বাংলাদেশের নানা পর্যায় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতা করেছেন, সরকারি চাকরি করেছেন এবং ১৯৮৮ সালে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন।
বিএনপি মহাসচিব তার বক্তব্যে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপি সরকারের সময় জেলার যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়েছিল, তার সুফল আজও সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে দৃশ্যমান। কথার উন্নয়ন নয়, পরিকল্পিত ও বাস্তব কাজের মাধ্যমেই তখন ঠাকুরগাঁওয়ে পরিবর্তন আসে। কৃষি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ—সব খাতে ছিল সমন্বিত অগ্রগতি।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালের মার্চ মাসে বরেন্দ্র মাল্টিপারপাস ভূগর্ভস্থ সেচ প্রকল্প উদ্বোধনের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। প্রকল্পটির আওতায় ১ হাজার ৩৩৭টি টিউবওয়েল আধুনিক ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়। এতে পানির অপচয় কমে, কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং ড্রেন নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ৫০ একর নতুন জমি চাষের আওতায় আসে। এই প্রকল্প ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও মজবুত করে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গোবিন্দনগরে ঠাকুরগাঁও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা এবং ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ভবনের শিলান্যাসের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান আজ হাজারো তরুণের কর্মসংস্থানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামকে গ্রামের সঙ্গে এবং মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। গ্রামীণ সড়ক ও সেতু নির্মাণে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ফলে কৃষি, ব্যবসা ও ঘরোয়া জীবনে গতি আসে। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজ ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষার আলো পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
বিএনপি সরকারের সময়ে জেলার সব বেসরকারি স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষক সমাজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সময়ে ১ হাজার ২৬০টি গভীর নলকূপ চালুর মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে, যা কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
উন্নয়নের পেছনে নেতৃত্ব ও পরিকল্পনার ভূমিকার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী কৃষিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজ করেন। কৃষক সমবায় ও আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষমতায়ন ছিল তার অন্যতম লক্ষ্য।
নিজের রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, বর্তমানে তার বয়স ৭৮ বছর এবং গত ১৭ বছর কেটেছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে। এ সময়ে তাকে ১১ বার কারাবরণ করতে হয়েছে। কী অর্জন করতে পেরেছেন, সে বিচার আল্লাহ ও জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি বলে জানান। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পরিবারের কথা বলতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি আজও মানুষের পাশে আছেন। তার স্ত্রী চাকরি করার পাশাপাশি সন্তানদের বড় করেছেন। দুই মেয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বড় মেয়ে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা শেষে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পরিবারকে পাশে পাওয়ার জন্য তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি দেশ ও তরুণ প্রজন্ম নিয়ে তার স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ফেডারেল মেডিকেল কাউন্সিলে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ১৯৮৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পর্যায়ক্রমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে মহাসচিব পদে উন্নীত হন। জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ও পরে সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। ২০১৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমান সরকার আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে।

ডিজিটাল ডেস্ক 


























বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা