আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি জনসংযোগে পোশাক ও ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উদারপন্থি, বামপন্থি, ধর্মভিত্তিক দল কিংবা স্বতন্ত্র— প্রায় সব ধরনের প্রার্থীর প্রচারণাতেই টুপি, পাঞ্জাবি ও ঘোমটার উপস্থিতি চোখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল পোশাক নয়— ধর্মকে ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদিনের চর্চা। ধর্মীয় স্লোগান, পোস্টার, মাজার জিয়ারত কিংবা ধর্মীয় জমায়েতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ভোটারদের আবেগে প্রভাব ফেলার চেষ্টা অতীতেও দেখা গেছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর ভোটারদের মধ্যে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এবারের নির্বাচনি জনসংযোগে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং ধর্মের ব্যবহার আগের চেয়ে আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
টুপি-পাঞ্জাবি ও ঘোমটায় জনসংযোগ
নির্বাচনি প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও প্রার্থীরা বেশ কিছুদিন ধরেই নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মসজিদ, জানাজা, শোকসভা কিংবা সামাজিক ও ধর্মীয় জমায়েতে অংশ নিতে গিয়ে পুরুষ প্রার্থীদের টুপি-পাঞ্জাবি এবং নারী প্রার্থীদের ঘোমটা পরতে দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার জনসংযোগের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে হঠাৎ ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
এ বিষয়ে পাটওয়ারী বলেন, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বাস্তবতা কাজ করে। বিশেষ করে মসজিদ বা সামাজিক জমায়েতে গেলে সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি চলে আসে।
ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি
তবে ভোটারদের বড় একটি অংশ নির্বাচনের সময় হঠাৎ পোশাক পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। অনেকেই এটিকে কৌশলগত ভণ্ডামি বলে মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, নির্বাচনের সময় ধর্মীয় লেবাস পরে ভোট চাইলে তা প্রতারণার মতো মনে হয়। কেউ কেউ আবার মনে করেন, গ্রামীণ ও ধর্মীয় আবহে এসব পোশাক ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
নোয়াখালীর এক ব্যবসায়ী জানান, অনেক প্রার্থী শুধু নির্বাচনের সময় ধর্মীয় পোশাক পরেন, পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যান। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থীর মতে, কেউ যদি ধর্মীয় পোশাক পরেও সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাতে আপত্তির কিছু নেই।
পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা?
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় পোশাক ব্যবহারের পেছনে বড় একটি কারণ হলো ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা দখলবাজির অভিযোগ থাকে। ধর্মীয় পোশাক এসব অভিযোগ আড়াল করে ভোটারদের কাছে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সহায়তা করে।
ইতিহাসে ধর্ম ও রাজনীতি
উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন নয়। ভারত-পাকিস্তান বিভাজন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আগের ও পরের নির্বাচনে ধর্মীয় স্লোগান ও আবেগ ব্যবহারের নজির রয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক ও পরবর্তী সময় পর্যন্ত প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনোভাবে ধর্মকে নির্বাচনি প্রচারণায় সামনে এনেছে।
পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন, রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহারের ঘটনাও আলোচিত হয়েছে।
আচরণবিধি ও বাস্তবতা
যদিও নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্মের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এর ব্যত্যয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে, বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটারদের অজ্ঞতা ও আবেগপ্রবণতাই রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারকে সহজ করে তোলে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো এবং আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগই নির্বাচনে ধর্মের অতিরিক্ত ব্যবহার রোধ করতে পারে। নইলে পোশাক ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ ঘিরে বিতর্ক ভবিষ্যতেও থেকে যাবে।

ডিজিটাল ডেস্ক 


























বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা