রাজস্ব ক্ষতি, ডলার পাচার ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বর্তমানে দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত বন্দর স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই এই টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। দেশীয় অপারেটর ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এনসিটি শুধু বন্দরের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার গতি বৃদ্ধি, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে এনসিটির আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরও বন্দরটিতে রেকর্ড পরিমাণ আয় হয়েছে। তবে এমন একটি লাভজনক ও কৌশলগত স্থাপনাকে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, লাভজনক এই টার্মিনালটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে রাষ্ট্র বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে। পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের ডলার বিদেশে চলে যাবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অনেকের মতে, এ ধরনের চুক্তি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে সরকারি পিপিপি নীতিমালা ও জাতীয় স্বার্থের সরাসরি লঙ্ঘন বলেও মনে করছেন।
বর্তমানে এনসিটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এবং দেশীয় অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। জার্মান পরামর্শক হামবার্গ পোর্ট কনসালটেন্টসের নকশা অনুযায়ী এনসিটির প্রাথমিক ধারণক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টিইইউ। তবে দেশীয় শ্রমিক ও অপারেটরদের দক্ষতায় বর্তমানে এখানে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০০৭ সালে যেখানে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ছিল ১০ থেকে ১২ দিন, সেখানে বর্তমানে তা কমে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। গত বছরের অক্টোবরে এনসিটিতে রেকর্ড ১ লাখ ২৩ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এনসিটিতে প্রতি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে গড়ে ১৬১ ডলার আয় হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ লাখ ১৩ হাজার ৪১২ টিইইউএস। সে হিসাবে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বন্দরের গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে বন্দরের নিট আয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০২৩ ও ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
এনসিটি চালুর পর থেকে গত ৬ জুলাই পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৭ জুলাই থেকে দায়িত্ব নেয় চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, নৌবাহিনীর অধীন এই প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেওয়ার পর এনসিটির পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল হয়েছে। জাহাজের অবস্থানকাল কমেছে এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ডও তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত চুক্তি কাঠামো অনুযায়ী বিদেশি অপারেটর প্রতি টিইইউএস কনটেইনার থেকে ১৬১ ডলার আয় করবে, আর চট্টগ্রাম বন্দর পাবে মাত্র ৫০ ডলার। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিপরীতে বন্দর পাবে মাত্র ৮০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাবে, তাও উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই।
বর্তমান ব্যবস্থায় এনসিটি পরিচালিত হলে বন্দরের আয় যেখানে বছরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, সেখানে বিদেশি অপারেটরের হাতে গেলে আয় কমে দাঁড়াবে প্রায় ৮০৭ কোটি টাকায়। ডলার সংকটের সময়ে এ ধরনের অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি পিপিপি নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশি অপারেটরকে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা থাকলেও এনসিটিতে নতুন বিনিয়োগের বাস্তব সুযোগ নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। আধুনিক ক্রেন, স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ার ও টার্মিনাল সফটওয়্যার ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ দেখিয়ে বিদেশিদের হাতে টার্মিনাল হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে।
সরকারের দাবি, বিদেশি অপারেটর এলে বন্দরের সক্ষমতা ও গতি বাড়বে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জোয়ার-ভাটাভিত্তিক বাস্তবতায় বিদেশি অপারেটর এলেও জাহাজের অপেক্ষা কমবে না। পাশাপাশি কাস্টমস ও নথি প্রক্রিয়ার জটিলতা না কমলে ডেলিভারি সময়ও কমবে না। এতে আড়াই থেকে তিন হাজার দেশীয় শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এনসিটির আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবন্দর সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা থাকায় বিদেশি অপারেটরের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
বন্দর রক্ষা পরিষদের সদস্য সচিব হুমায়ুন কবীর বলেন, জাহাজ ভেড়ানোর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টার মধ্যেই কনটেইনার ডেলিভারি দেয়। মূল বিলম্ব ঘটে এনওসি পেতে দেরির কারণে। তিনি বলেন, জোয়ার-ভাটার বাস্তবতা বিদেশি অপারেটর এলেও বদলাবে না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকারের ভেতরের একটি মহল বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে তড়িঘড়ি করে ক্ষতিকর চুক্তি করতে চাইছে। জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এড়িয়ে গোপনে চুক্তি করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে এনসিটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে করা রিটে আদালতে শুনানি চলমান রয়েছে। উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ এই প্রক্রিয়াকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করলেও অপর বেঞ্চ ভিন্নমত দেয়। বিষয়টি বর্তমানে প্রধান বিচারপতির নির্ধারিত বেঞ্চে বিচারাধীন।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশীয় অপারেটরদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে উন্নতি করেছে। তাদের মতে, এনসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া হলে তা হবে দেশের রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌমত্বের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিজিটাল ডেস্ক 


























বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা