যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের জন্য বৈধ কাজের ভিসা পাওয়ার আশায় গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ কালোবাজার। ভুয়া চাকরির বিনিময়ে বিপুল অর্থের মাধ্যমে কাজের ভিসা নিশ্চিত করার এই চক্রে জড়িত রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী, ভিসা এজেন্ট এবং কিছু লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যেসব চাকরির কথা দেখিয়ে ভিসা স্পনসরশিপ দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলোর অনেকগুলোরই কোনো অস্তিত্ব নেই।
পূর্ব লন্ডনের একটি রেস্তোরাঁয় গোপনে ধারণ করা এক বৈঠকে এক ভিসা এজেন্ট স্পষ্টভাবে জানান, কীভাবে তিনি হোম অফিসকে ফাঁকি দিয়ে একজন অভিবাসীর জন্য স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা নিশ্চিত করবেন। তার ভাষায়, কাগজে-কলমে সবকিছু থাকবে নিখুঁত—ভুয়া সিভি, সাজানো বেতন কাঠামো, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও পে-রোল নথি। কিন্তু বাস্তবে চাকরিটি কখনোই থাকবে না। কৌশল অনুযায়ী, ভিসাধারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হবে দেখানো হলেও প্রতি মাসে সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে, সঙ্গে অতিরিক্ত ফি যোগ করতে হবে।
এই ধরনের ভুয়া ভিসা স্পনসরশিপের জন্য ১৩ হাজার থেকে ২০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। যদিও এতে ধরা পড়লে বহিষ্কার বা ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে, তবুও অনেক অভিবাসীর কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যে থাকার একমাত্র সুযোগ বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ বছর কাজের অভিজ্ঞতা দেখাতে পারলে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা চক্রটি ভুয়া নথিকেই ‘প্রমাণ’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
চার মাসের অনুসন্ধানে ২৬ জন ভিসা এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ২৫০টির বেশি ভুয়া চাকরির অফারের নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব চাকরি দেখানো হয়েছে রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, লজিস্টিকস এবং সামাজিক সেবা খাতে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী স্পনসর করছে, সেখানে বাস্তবে কোনো কর্মীই নেই।
এই ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহারের ফলে অনেক অভিবাসী পরে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ছেন। ভুয়া চাকরির আড়ালে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অবৈধ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কিছু এজেন্ট দাবি করেন, স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা থাকলে অন্য জায়গায় পার্টটাইম কাজ করা সম্ভব। বাস্তবে এসব দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ফলে অনেকে পুরোপুরি কালোবাজারি শ্রম ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং অবৈধ কার্যক্রম কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। গত এক বছরে প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠানের স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান শাস্তির মাত্রা কম হওয়ায় এই অবৈধ নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে দমন করা যাচ্ছে না। জাতীয় অপরাধ সংস্থাও আগেই সতর্ক করেছিল যে, স্পনসর লাইসেন্স ব্যবস্থা প্রতারণার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালে চালু হওয়া স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা এবং পরবর্তী সময়ে সামাজিক সেবা খাতে এর বিস্তারের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পান। পরে নিয়ম কঠোর হওয়ায় অনেকেই বৈধ চাকরি হারান এবং বিকল্প হিসেবে এই অবৈধ পথে ঝুঁকতে বাধ্য হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু লাইসেন্স বাতিল করলেই এই ভয়াবহ কালোবাজার বন্ধ হবে না। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, কঠোর শাস্তি ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারিই পারে এই অবৈধ ভিসা বাণিজ্য কার্যকরভাবে ঠেকাতে।

ডেস্ক : 

























যানবাহনে জ্বালানি তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিলো সরকার