ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজউক পরিদর্শক সংকটে ভুগছে নিয়ন্ত্রণহীন শহর গড়ে উঠছে মরণফাঁদ

  • ডেস্ক :
  • আপডেট সময় ০৪:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫
  • 61
21
ইসলাম সবুজ :

রাজধানী সিটি যেন মরণফাঁদ” এই কথাটি শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা হচ্ছে, যেখানে পুরনো ভবনগুলির কারণে জীবনযাত্রায় ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে পুরনো ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে সুনির্দিষ্ট নকশা তোয়াক্কা না করে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। নেই তদারকি, নেই আইনের প্রয়োগ। চারজন পরিদর্শক দিয়ে চলছে হাজারো ভবনের দেখভাল যেখানে প্রয়োজন অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ইমারত পরিদর্শক। এই শূন্যতা আজ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়,এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজউকের জোন ৬/১ ঢাকার অন্যতম বড় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এলাকা। বিস্তৃত এই এলাকায় রয়েছে রামপুরা,বণশ্রী, মগবাজার,বাসাবো,নন্দিপাড়া, সবুজবাগ, গ্রীন মডেল টাউন সহ বিস্তির্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। এই এলাকাগুলোতে রয়েছে কয়েক হাজার নির্মাণাধীন ভবন তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র চারজন ইমারত পরিদর্শক! রাজউকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি জোনে ১৫-২০ দক্ষ পরিদর্শক না থাকলে ভবন নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব। এই চারজন দিয়ে এত বিশাল এলাকার নজরদারি করা বাস্তবসম্মত নয়।”

এভাবে নির্মাণ ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য সুযোগ। তারা নিয়মের তোয়াক্কা না করে গড়ে তুলছে ভবন—যার অনেকগুলো অনুমোদনহীন, নকশাবহির্ভূত এবং প্রাণঘাতী। আসলে এটা কিসের ইঙ্গিত? এটা কি অসাধু ভবন নির্মাতাদের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে না তো?  যেখানে ইমারত পরিদর্শক  প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না ? প্রতিনিয়তই ভবন উঠছে কে নিবে এই দায়ভার?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে  নির্মাণ বেড়ে চলছে,জীবন নিরাপত্তা কমছে। দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঢাকায় অবৈধ নির্মাণ সাইটের সংখ্যা ছিল ৩,৩৮২টি—রাজউক নিজেই তা চিহ্নিত করে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১৫,০০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয় অবৈধ ও অপরিকল্পিত ভবনে। ২০২৪ সালের সিদ্ধিকবাজার ট্র্যাজেডিতে, মাত্র ১০ মিনিটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ৬৮৩টি ভবনে—বেশিরভাগের বেজমেন্টে ছিল দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ।

রাজউক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, আমরা অভিযোগ পাই, কিন্তু পরিদর্শক না থাকলে সবখানে যাওয়া সম্ভব নয়। নোটিশ দিয়ে থামানো যায় না, কারণ প্রভাবশালী লোকজন মাঠে বাধা দেয়। প্রশ্ন কেন এই নীরবতা? একজন পরিদর্শকের একদিন: অসহায়তার ছায়া একজন পরিদর্শকের দৈনিক কাজের বিবরণ থেকে উঠে আসে চরম হতাশা— সকাল ৮টা        অফিসে বসে সাইট তালিকা তৈরি ১০টা    বাসাবো,, সবুজবাগ নির্মাণ সাইটে যান—নকশার বাইরে নির্মাণ চলছে।

১২টা    ,নন্দিপাড়া, সবুজবাগ প্রভাবশালীদের হুমকি, কাজ বন্ধ করাও সম্ভব নয়, ৩টা      মোবাইল কোর্ট—রাজনৈতিক নির্দেশে অভিযান স্থগিত,৬টা      অফিসে ফিরে রিপোর্ট তৈরি রাত ৮টা           ফোনে অভিযোগ, হুমকি ও অনুরোধের চাপে মনোবল হারানো। তিনি বলেন, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। কিন্তু প্রভাব আর নিরাপত্তাহীনতায় নীরব থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখি না।” জনসাধারণ কী বলছে? মোহাম্মদ আলী, সবুজবাগ নিয়মের বাইরে ভবন হচ্ছে, আমাদের ফ্ল্যাটে ফাটল ধরছে। কেউ জবাব দেয় না। এসব কি রাজউকের চোখে পড়ে না?” সাদ্দাম হোসেন, ব্যবসায়ী,বাসাবো, রাজউকের অফিসাররা আসে, ছবি তোলে, পরে কিছুই হয় না। তারা কী করে জানি না। আসলেই কিছু করার ক্ষমতা নেই?”

নগর পরিকল্পনাবিদ, বলেন : নিয়মিত পরিদর্শক না থাকলে সঠিক বিল্ডিং কোড মানা সম্ভব নয়। জনগণ জানেই না তাদের বাড়ি কোথায় কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে। এটা শুধু দুর্নীতি নয়, গণহত্যার মতো বিপর্যয়ের ডাক। এক জন  সিনিয়র প্ল্যানার,  (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মোবাইল কোর্ট চালু থাকলেও, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। রাজউকের কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে  বিপর্যয় ঠেকাতে জরুরি পরিকল্পনা :

১. ১৫–২০ জন পরিদর্শক নিয়োগ প্রতিটি বড় জোনে

২. জিও-ট্যাগড ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম

৩. অভিযান পরিচালনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধাহীন সহায়তা

৪. নাগরিক ফিডব্যাক হটলাইন চালু এবং গণমাধ্যমে প্রকাশযোগ্য রিপোর্টিং ব্যবস্থা

৫. DAP বাস্তবায়নে অংশগ্রহণমূলক পরিদর্শন ও পরিকল্পনাবিদ সংযুক্তিকরণ।

ভবনের ভেতরে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ছায়া রাজউকের জোন ৬/১ বর্তমানে আইনহীন ভবন তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। ইমারত পরিদর্শক মানে ভবনের চোখ। চোখ বন্ধ হলে, সিস্টেম অন্ধ হয়ে পড়ে। আর অন্ধ সিস্টেম মানেই ধ্বংস,” বললেন এক ভেটেরান নগর পরিকল্পনাবিদ। সচেতনতা না এলে, নিয়োগ না হলে, এবং শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে—ঢাকা শহর আগামী দুর্যোগে কেবল মৃত্যু আর ধ্বংসের গল্প হবে। একটি আহ্বান— শুধু সরকারের নয়, আপনারও। নীরবতা নয়, দায়িত্ব নিন। ভবন নয়, নিরাপদ বাসস্থান চাই। কারণ প্রতিটি দেয়ালের পেছনে আছে জীবনের গল্প, ভয়ংকর ভবিষ্যত নয়।

ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আগ্রহ আমিরাতের ডিনাটার

রাজউক পরিদর্শক সংকটে ভুগছে নিয়ন্ত্রণহীন শহর গড়ে উঠছে মরণফাঁদ

আপডেট সময় ০৪:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫
21
ইসলাম সবুজ :

রাজধানী সিটি যেন মরণফাঁদ” এই কথাটি শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা হচ্ছে, যেখানে পুরনো ভবনগুলির কারণে জীবনযাত্রায় ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে পুরনো ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে সুনির্দিষ্ট নকশা তোয়াক্কা না করে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। নেই তদারকি, নেই আইনের প্রয়োগ। চারজন পরিদর্শক দিয়ে চলছে হাজারো ভবনের দেখভাল যেখানে প্রয়োজন অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ইমারত পরিদর্শক। এই শূন্যতা আজ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়,এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজউকের জোন ৬/১ ঢাকার অন্যতম বড় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এলাকা। বিস্তৃত এই এলাকায় রয়েছে রামপুরা,বণশ্রী, মগবাজার,বাসাবো,নন্দিপাড়া, সবুজবাগ, গ্রীন মডেল টাউন সহ বিস্তির্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। এই এলাকাগুলোতে রয়েছে কয়েক হাজার নির্মাণাধীন ভবন তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র চারজন ইমারত পরিদর্শক! রাজউকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি জোনে ১৫-২০ দক্ষ পরিদর্শক না থাকলে ভবন নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব। এই চারজন দিয়ে এত বিশাল এলাকার নজরদারি করা বাস্তবসম্মত নয়।”

এভাবে নির্মাণ ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য সুযোগ। তারা নিয়মের তোয়াক্কা না করে গড়ে তুলছে ভবন—যার অনেকগুলো অনুমোদনহীন, নকশাবহির্ভূত এবং প্রাণঘাতী। আসলে এটা কিসের ইঙ্গিত? এটা কি অসাধু ভবন নির্মাতাদের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে না তো?  যেখানে ইমারত পরিদর্শক  প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না ? প্রতিনিয়তই ভবন উঠছে কে নিবে এই দায়ভার?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে  নির্মাণ বেড়ে চলছে,জীবন নিরাপত্তা কমছে। দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঢাকায় অবৈধ নির্মাণ সাইটের সংখ্যা ছিল ৩,৩৮২টি—রাজউক নিজেই তা চিহ্নিত করে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১৫,০০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয় অবৈধ ও অপরিকল্পিত ভবনে। ২০২৪ সালের সিদ্ধিকবাজার ট্র্যাজেডিতে, মাত্র ১০ মিনিটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ৬৮৩টি ভবনে—বেশিরভাগের বেজমেন্টে ছিল দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ।

রাজউক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, আমরা অভিযোগ পাই, কিন্তু পরিদর্শক না থাকলে সবখানে যাওয়া সম্ভব নয়। নোটিশ দিয়ে থামানো যায় না, কারণ প্রভাবশালী লোকজন মাঠে বাধা দেয়। প্রশ্ন কেন এই নীরবতা? একজন পরিদর্শকের একদিন: অসহায়তার ছায়া একজন পরিদর্শকের দৈনিক কাজের বিবরণ থেকে উঠে আসে চরম হতাশা— সকাল ৮টা        অফিসে বসে সাইট তালিকা তৈরি ১০টা    বাসাবো,, সবুজবাগ নির্মাণ সাইটে যান—নকশার বাইরে নির্মাণ চলছে।

১২টা    ,নন্দিপাড়া, সবুজবাগ প্রভাবশালীদের হুমকি, কাজ বন্ধ করাও সম্ভব নয়, ৩টা      মোবাইল কোর্ট—রাজনৈতিক নির্দেশে অভিযান স্থগিত,৬টা      অফিসে ফিরে রিপোর্ট তৈরি রাত ৮টা           ফোনে অভিযোগ, হুমকি ও অনুরোধের চাপে মনোবল হারানো। তিনি বলেন, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। কিন্তু প্রভাব আর নিরাপত্তাহীনতায় নীরব থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখি না।” জনসাধারণ কী বলছে? মোহাম্মদ আলী, সবুজবাগ নিয়মের বাইরে ভবন হচ্ছে, আমাদের ফ্ল্যাটে ফাটল ধরছে। কেউ জবাব দেয় না। এসব কি রাজউকের চোখে পড়ে না?” সাদ্দাম হোসেন, ব্যবসায়ী,বাসাবো, রাজউকের অফিসাররা আসে, ছবি তোলে, পরে কিছুই হয় না। তারা কী করে জানি না। আসলেই কিছু করার ক্ষমতা নেই?”

নগর পরিকল্পনাবিদ, বলেন : নিয়মিত পরিদর্শক না থাকলে সঠিক বিল্ডিং কোড মানা সম্ভব নয়। জনগণ জানেই না তাদের বাড়ি কোথায় কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে। এটা শুধু দুর্নীতি নয়, গণহত্যার মতো বিপর্যয়ের ডাক। এক জন  সিনিয়র প্ল্যানার,  (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মোবাইল কোর্ট চালু থাকলেও, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। রাজউকের কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে  বিপর্যয় ঠেকাতে জরুরি পরিকল্পনা :

১. ১৫–২০ জন পরিদর্শক নিয়োগ প্রতিটি বড় জোনে

২. জিও-ট্যাগড ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম

৩. অভিযান পরিচালনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধাহীন সহায়তা

৪. নাগরিক ফিডব্যাক হটলাইন চালু এবং গণমাধ্যমে প্রকাশযোগ্য রিপোর্টিং ব্যবস্থা

৫. DAP বাস্তবায়নে অংশগ্রহণমূলক পরিদর্শন ও পরিকল্পনাবিদ সংযুক্তিকরণ।

ভবনের ভেতরে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ছায়া রাজউকের জোন ৬/১ বর্তমানে আইনহীন ভবন তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। ইমারত পরিদর্শক মানে ভবনের চোখ। চোখ বন্ধ হলে, সিস্টেম অন্ধ হয়ে পড়ে। আর অন্ধ সিস্টেম মানেই ধ্বংস,” বললেন এক ভেটেরান নগর পরিকল্পনাবিদ। সচেতনতা না এলে, নিয়োগ না হলে, এবং শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে—ঢাকা শহর আগামী দুর্যোগে কেবল মৃত্যু আর ধ্বংসের গল্প হবে। একটি আহ্বান— শুধু সরকারের নয়, আপনারও। নীরবতা নয়, দায়িত্ব নিন। ভবন নয়, নিরাপদ বাসস্থান চাই। কারণ প্রতিটি দেয়ালের পেছনে আছে জীবনের গল্প, ভয়ংকর ভবিষ্যত নয়।