ঢাকা , মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রের গলার কাঁটা এফডিসি

  • ইসমাইল হোসেন
  • আপডেট সময় ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 62
88

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) এখন সরকারে জন্য এক ধরনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রধান আঁতুড়ঘর হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি লোকশানের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। বছরে যেখানে আয় মাত্র চার কোটি টাকা, সেখানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি টাকায়—যা আয়ের প্রায় চার গুণেরও বেশি।

প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের মতে, অব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়নের ঘাটতি, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তির অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এফডিসি তার পূর্বের জৌলুস হারিয়েছে। বিগত ১৬ বছরে আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ না হওয়ায় স্টুডিওগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পুরনো ও অপ্রতুল সরঞ্জামের কারণে শুটিং, ডাবিং, এডিটিং–সব ক্ষেত্রেই কাজ প্রায় বন্ধের পর্যায়ে।

আয়-ব্যয়ের বিপর্যয়কর চিত্র

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দুই অর্থবছরে এফডিসির মোট আয় হয়েছে ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি টাকারও বেশি।

২০২৩–২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, ব্যয় ২৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়, কিন্তু ব্যয় বেড়ে হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ঘাটতি পূরণের পুরো টাকা সরকারকেই বহন করতে হয়।

অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সাড়ে সাত একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এফডিসিতে একসময় ছিল ৯টি আধুনিক ফ্লোর, সুইমিংপুল, ঝরনা, বাগানসহ নানা শুটিং স্পট। বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য জায়গা বলতে কেবল প্রশাসনিক ভবনের সামনে সীমিত একটি অংশ ছাড়া প্রায় সব জায়গাই অকার্যকর।

২০১৫–১৬ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকার থেকে অনুদান পাওয়া গেছে ৩১ কোটি টাকার বেশি। পাশাপাশি ঋণ নিতে হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ১০ বছরে অনুদান ও ঋণ মিলিয়ে মোট ৮০ কোটিরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়েছে

এফডিসির আয়ের মূল উৎস—ফ্লোর ভাড়া, সেট নির্মাণ, ক্যামেরা, লাইট, শব্দ, এডিটিং সরঞ্জাম—এসবই এখন পুরনো ও অচল। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসবের ব্যবহার কমে যাওয়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। ফ্লোরে শুটিং বেড়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত হচ্ছে। তবে কার্যকর পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন বড় ধরনের আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ।

সরঞ্জামের তালিকা—বেশিরভাগই নষ্ট বা অচল

  • বর্তমানে থাকা ৮টি ক্যামেরার মধ্যে সচল মাত্র ৩টি।
  • ডাবিং মেশিন, সাউন্ড মিক্সিং মেশিন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সিস্টেম—সবই দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।
  • আধুনিক ৫.১ বা ৭.১ সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম নেই।
  • এডিটিং মেশিন ব্যাকডেটেড, ডিসিপি মেশিন নষ্ট, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস সুবিধা নেই।
  • পুরনো জিমি জিব ক্রেইন চালানোর মতো দক্ষ জনবলও নেই।
  • বেশিরভাগ ফ্লোরে পানি পড়ে, এসিও কাজ করে না।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মন্তব্য

তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সম্পূর্ণ লজিস্টিক সাপোর্ট ও দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া এফডিসিকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। মাস শেষে বেতন-ভাতা ও ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর এফডিসি সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দিয়েছিল ১৯৯৯–২০০০ অর্থবছরে—১১ কোটি টাকার বেশি। এরপর থেকেই রাজস্ব কমতে থাকে। ২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

পবিত্র শবেবরাত আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাতে পালিত হবে

রাষ্ট্রের গলার কাঁটা এফডিসি

আপডেট সময় ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
88

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) এখন সরকারে জন্য এক ধরনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রধান আঁতুড়ঘর হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি লোকশানের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। বছরে যেখানে আয় মাত্র চার কোটি টাকা, সেখানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি টাকায়—যা আয়ের প্রায় চার গুণেরও বেশি।

প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের মতে, অব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়নের ঘাটতি, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তির অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এফডিসি তার পূর্বের জৌলুস হারিয়েছে। বিগত ১৬ বছরে আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ না হওয়ায় স্টুডিওগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পুরনো ও অপ্রতুল সরঞ্জামের কারণে শুটিং, ডাবিং, এডিটিং–সব ক্ষেত্রেই কাজ প্রায় বন্ধের পর্যায়ে।

আয়-ব্যয়ের বিপর্যয়কর চিত্র

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দুই অর্থবছরে এফডিসির মোট আয় হয়েছে ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি টাকারও বেশি।

২০২৩–২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, ব্যয় ২৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়, কিন্তু ব্যয় বেড়ে হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ঘাটতি পূরণের পুরো টাকা সরকারকেই বহন করতে হয়।

অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সাড়ে সাত একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এফডিসিতে একসময় ছিল ৯টি আধুনিক ফ্লোর, সুইমিংপুল, ঝরনা, বাগানসহ নানা শুটিং স্পট। বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য জায়গা বলতে কেবল প্রশাসনিক ভবনের সামনে সীমিত একটি অংশ ছাড়া প্রায় সব জায়গাই অকার্যকর।

২০১৫–১৬ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকার থেকে অনুদান পাওয়া গেছে ৩১ কোটি টাকার বেশি। পাশাপাশি ঋণ নিতে হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ১০ বছরে অনুদান ও ঋণ মিলিয়ে মোট ৮০ কোটিরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়েছে

এফডিসির আয়ের মূল উৎস—ফ্লোর ভাড়া, সেট নির্মাণ, ক্যামেরা, লাইট, শব্দ, এডিটিং সরঞ্জাম—এসবই এখন পুরনো ও অচল। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসবের ব্যবহার কমে যাওয়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। ফ্লোরে শুটিং বেড়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত হচ্ছে। তবে কার্যকর পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন বড় ধরনের আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ।

সরঞ্জামের তালিকা—বেশিরভাগই নষ্ট বা অচল

  • বর্তমানে থাকা ৮টি ক্যামেরার মধ্যে সচল মাত্র ৩টি।
  • ডাবিং মেশিন, সাউন্ড মিক্সিং মেশিন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সিস্টেম—সবই দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।
  • আধুনিক ৫.১ বা ৭.১ সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম নেই।
  • এডিটিং মেশিন ব্যাকডেটেড, ডিসিপি মেশিন নষ্ট, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস সুবিধা নেই।
  • পুরনো জিমি জিব ক্রেইন চালানোর মতো দক্ষ জনবলও নেই।
  • বেশিরভাগ ফ্লোরে পানি পড়ে, এসিও কাজ করে না।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মন্তব্য

তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সম্পূর্ণ লজিস্টিক সাপোর্ট ও দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া এফডিসিকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। মাস শেষে বেতন-ভাতা ও ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর এফডিসি সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দিয়েছিল ১৯৯৯–২০০০ অর্থবছরে—১১ কোটি টাকার বেশি। এরপর থেকেই রাজস্ব কমতে থাকে। ২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।