গল্পটা প্রায় সবারই জানা। ঈশপের সেই গল্প। গরীব কৃষকের পালিত একটা হাঁস প্রতিদিন হঠাৎ করে একেকটি সোনার ডিম পাড়তে শুরু করলো। কৃষক তো মহাখুশি। তবে কৃষক দৈনিক একটা সোনার ডিমের জন্য অধীর অপেক্ষায় রাজি নয়। লোভী কৃষক সোনার সব ডিম একসঙ্গে পেতে হাঁসটি জবাই করে দেখলো হাঁসের পেট শূন্য! এখন অতলোভী কৃষক বুক চাপড়ে কাঁদছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ কন্টেইনার স্থাপনা হচ্ছে নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি)। এটি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি বছর মুনাফা বাবদ নিজস্ব টাকায় নির্মিত এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি (ইকুইপমেন্ট) সমৃদ্ধ স্বয়ংসম্পূর্ণ কন্টেইনার টার্মিনাল।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ কন্টেইনার স্থাপনা হচ্ছে নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি)। এটি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি বছর মুনাফা বাবদ নিজস্ব টাকায় নির্মিত এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি (ইকুইপমেন্ট) সমৃদ্ধ স্বয়ংসম্পূর্ণ কন্টেইনার টার্মিনাল।
এক কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সুপরিসর নিউমুরিং টার্মিনালের জেটি বার্থে একসঙ্গে চারটি জাহাজ ভিড়তে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি রফতানিমুখী ৯৫ শতাংশ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়; এরমধ্যে ৬০ ভাগই হয়ে থাকে এনসিটি দিয়ে। বন্দরের মোট আয়ের ৪০ শতাংশই আসছে এনসিটির মাধ্যমে।
সেই নিরবচ্ছিন্ন মুনাফা অর্জনকারী এবং অত্যাধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে একটি দীর্ঘমেয়াদী কনসেশন তথা ইজারা চুক্তির মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। দুবাই ভিত্তিক বহুল আলোচিত কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল কবে?
মজার ব্যাপার হলো, গনঅভ্যুত্থানে উৎখাত ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে ২০২৩ সালে নীতগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যাতে বিদেশি বিশেষ কোম্পানিটির সঙ্গে হাসিনার নিকটাত্মীয় ও আওয়ামী অলিগার্করা যুক্ত হন। শ্রমিক কর্মচারী সংগঠন ও জোটের তীব্র বিরোধিতার মুখে হাসিনা সরকার সেই সিদ্ধান্ত বা উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারেনি।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাসিনা সরকারের নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত এগিয়ে নিয়ে এসেছে এবং এখনই বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ বছর দীর্ঘ মেয়াদি একটি ইজারা কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে তড়িঘড়ি।
সারা দেশ এ মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচনমুখী এবং উদগ্রীব। ভোটের বাকি আছে আর মাত্র ৬ দিন। এরমধ্যে সরকারি কর্মদিবস হাতে আছে মাত্র দুই তিন দিন। অন্তবর্তী সরকারের কর্তারা এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই যেনতেন প্রকারে একটা ইজারা চুক্তির পাট চুকিয়ে ফেলার জন্য বিদ্যুৎ বেগে এগুচ্ছে বলে অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে। চুক্তির শর্ত কী তাও অজানা। আর, সম্ভাব্য যেকোনো সময়ে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে আঁচ করে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক কর্মচারী সংগঠনগুলো এবং জাতীয় শ্রমিক জোট শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) ডাকে গত শনিবার থেকে গতকাল ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন চট্টগ্রাম বন্দরে প্রচন্ড বিক্ষোভ, প্রতিবাদী মিছিল, কালো পতাকা মিছিল, অবরোধ, লাগাতার কর্মবিরতি কর্মসূচি পালিত হয়। নজিরবিহীন অচলাবস্থায় পড়ে চট্টগ্রাম বন্দর।
বৃহস্পতিবার নৌ উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দর সফরে এসে শ্রমিক কর্মচারী সংগঠন নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে চুক্তির বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কথা বলে সুরাহার আশ্বাস দেন। এই শর্তে কর্মবিরতি কর্মসূচি দুই দিন স্থগিত করা হলেও প্রত্যাহার করা হয়নি। অন্যদিকে শ্রমিক কর্মচারী নেতাদের আশ্বাস দেওয়া হলেও তাদের মূল দাবি অর্থাৎ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা চুক্তির প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার কোনো আলামত দৃশ্যমান নেই। বরং আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারী নেতাদের ১৫ জনের কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্র বিরোধী উল্লেখ করে তাদের সম্পদের বিষয়ে দুদকের মাধ্যমে তদন্তের এবং বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর সঙ্কট আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে এমনটা আশঙ্কা করছেন পোর্ট শিপিং সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, অন্তবর্তী সরকারের সময় আছে আর মাত্র কয়েকটা দিন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কেন এতোটা জেদাজেদি সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। বিষয়টা এখন রহস্যজনকই মনে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ এবং বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন নির্মাণ শেষ হয় ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। দীর্ঘ সময় ধরে এনসিটি দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালনা করা হয়; যদিও এক্ষেত্রে অনিয়ম, দলীয়করণ ও বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি করা হয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণে রেখেই দেশীয় অপারেটর দিয়ে লাভজনকভাবে এটি পরিচালিত হয় এবং দেশীয় অপারেটর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়। এ পর্যায়ে আওয়ামী আমলে ২০২৩ সালের ১২ জুন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মুখ্যসচিবের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ-দুবাই জয়েন পিপিপি প্লাটফর্ম সভায় এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পার নিউমুরিং টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরপরই শ্রমিক কর্মচারী রাজনৈতিক পেশাজীবিসহ বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ আসতে থাকে। মাঠের আন্দোলন হয়ে ওঠে প্রবল। বর্তমান পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে অস্বাভাবিক ঝটিকা বেগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে এনসিটি হস্তান্তরের জন্য তোড়জোড় চলছে। বৃহস্পতিবার নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর সফরে এসে বলেন, চুক্তি ঠেকানো যাবে না।
সরকারের পক্ষ থেকে আগে থেকেই বলা হয়েছে, বিপুল অঙ্কের বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগের বিরোধিতাকারীরাই চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিদেশি কোম্পানি দায়িত্বে এলে বন্দরের সক্ষমতা পাঁচগুণ দশগুণ বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম বন্দর হবে বৈশ্বিক মানসম্পন্ন। দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ আসবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, পোর্ট শিপিং সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং আন্দোলনকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল এনসিটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইকুইপমেন্ট সবকিছুই রয়েছে। কী গ্যানট্রি ক্রেনসহ ইকুইপমেন্টের কোনো কোনোটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশীই রয়েছে। সবগুলোই বন্দরের নিজস্ব টাকায় ক্রয় করা হয়। জোয়ার ভাটা নির্ভর ড্রাফটের সীমাবদ্ধতার কারণে এনসিটিতে আরও বড়সড় আকৃতির এবং আরো বেশি সংখ্যক জাহাজ ভিড়ানোর অবকাশ নেই। তাছাড়া নিউমুরিং টার্মিনালের ঠিক লাগোয়া হচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান স্থাপনা। সবকিছু মিলিয়ে এনসিটি সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি সংযোজন কিংবা এখানে বিদেশি কোনো কোম্পানির বিনিয়োগের আর তেমন কোনো সুযোগই অবশিষ্ট নেই। ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতা খুব বেশি বৃদ্ধি করতে পারবে না। তারা কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লক্ষ কোটি ডলার নিয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতারা বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বছরে কমপক্ষে এগারো শত কোটি টাকা তুলে নিয়ে যাবে। এরইমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কয়েকগুণ মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এসব যুক্তির বিপরীতে কোনো জবাব সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
২০২৩ সালের পর থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে যে লোকজন চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে নানা সার্ভের কাজে জড়িত ছিল এবং সভায় উপস্থিত ছিল তারা বেশিরভাগই ভারতীয় নাগরিক। বন্দরের শ্রমিক নেতারা এ বিষয়ে আগেই বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট মহলে আশঙ্কা রয়েছে, দুবাই থেকে নয়; বরং ডিপি ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া বাংলাদেশের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা করবে।
সেই সঙ্গে আলোচিত আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রভাবশালী একজন আওয়ামী নেতা এবং ব্যবসায়ীকে এ সরকারের সময় গ্রেফতারের পরই অতি দ্রুত জামিন মঞ্জুর করা হয়। তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্থানীয় অংশীদার। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তাহলে কী ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাত ধরে পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার শেখ পরিবার এবং আওয়ামী ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে?

ডিজিটাল ডেস্ক 


























গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন বিল পাস