দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিখাত তৈরি পোশাক শিল্প ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কাজ হারাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ছোট, মাঝারি কিংবা বড়—সব আকারের শিল্পেই অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার লড়াই চলছে।
২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এ সংকট ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২২ মাস ১০ দিনে বন্ধ হয়ে গেছে ২২৬টি পোশাক কারখানা। এ সময়ে বেকার হয়েছেন দুই লাখের বেশি শ্রমিক।
গ্যাস–বিদ্যুৎ ও ব্যাংক নীতির ধাক্কা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্বাভাবিক হারে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণনীতির হঠাৎ পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে পারছে না পোশাকশিল্প।
- গ্যাসের দাম:
- ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম এক লাফে প্রতি ঘনমিটারে ১৪ টাকা বাড়ানো হয়।
- এর আগে ২০২২ সালের জুনে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে দাম করা হয় ১৬ টাকা।
- ২০২৪ সালেও দুই দফা গ্যাসের দাম বাড়ে।
- বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৩১ টাকা ৫০ পয়সা; নতুন শিল্প সংযোগে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, আগের সরকারের আত্মঘাতী জ্বালানি নীতি এবং বর্তমান সরকারের নতুন শিল্পের জন্য অতিরিক্ত গ্যাসমূল্য—দুই মিলে দেশি শিল্পকে চরম সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
- বিদ্যুতের দাম:
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুতের দামও কয়েক দফা বাড়ানো হয়।- ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা করা হয়।
- পরবর্তী সমন্বয়ের ফলে বর্তমানে শিল্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৫০ পয়সা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্রেতারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্য কিনে; তাদের কাছে বাংলাদেশে গ্যাস–বিদ্যুতের দাম কিংবা ব্যাংকের সুদের হার কোনো অজুহাত নয়। ফলে খরচ বাড়লেও বিক্রিমূল্য বাড়ানো যাচ্ছে না, আর এই চাপ টিকিয়ে রাখা অনেক কারখানার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকঋণের সুদ গুনতেই ফুরিয়ে যাচ্ছে আয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক নীতিপরিবর্তনের ফলে ঋণের সুদহার একসময়কার ৯ শতাংশ সীমা অতিক্রম করে এখন অনেক ক্ষেত্রে ১৬–১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে উদ্যোক্তার ওপর ঋণ ব্যয়ের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন—
- উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো এখন কার্যত অসম্ভব।
- দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও বেশি সুদ নিচ্ছে, ফলে অনেক কারখানা শুধু সুদ পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
- ঋণের ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে না এলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও শিল্প সম্প্রসারণ লক্ষ্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ঋণের ব্যয় কমানো না হলে ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের বিকল্প হিসেবে নীতি সহায়তা না বাড়ালে নতুন বিনিয়োগ আসবে না; বরং বিদ্যমান ব্যবসাও স্থবির হয়ে পড়বে। তাঁর মতে, ১৫–১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প চালু রাখা প্রায় অসম্ভব।
খেলাপি সংজ্ঞা বদলে ‘ফাঁদে’ মালিকেরা
আগে নিয়ম ছিল, ঋণের কিস্তি বা আসল পরিশোধে ব্যর্থ হলে ছয় মাস পর সেই ঋণকে খেলাপি ধরা হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিতে খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা কমিয়ে তিন মাস (৯০ দিন) করা হয়েছে। ফলে—
- অল্প সময়ের মধ্যে অনেকে খেলাপি তালিকায় চলে গেছেন,
- ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে,
- অনেক কারখানা মালিক বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন।
বিজিএমইএর হিসেবে, কয়েকশ’ পোশাক কারখানার মালিক ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। সংগঠনের সভাপতি জানান, প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন কারখানা বন্ধের খবর আসছে; কেউ সম্পদ বিক্রি করে দেন, কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন।
বিজিএমইএ–বিকেএমইএ’র ভাষ্যে সংকট
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন—
- ব্যাংকঋণের সুদহার এক লাফে ৯ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি করা,
- খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ছয় মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনা,
- এবং শেষ সময়ে এসে বিপুল অঙ্কের গ্যাস বিল চাপিয়ে দেওয়া—এই তিনটি সিদ্ধান্ত মিলেই বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
তিনি মনে করেন, গ্যাসের চড়া মূল্য ও ব্যাংকঋণের সুদের চাপ সামলে অনেক মালিক আর টিকে থাকতে পারছেন না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় কিছু উদ্যোক্তার দেশ ছাড়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সামনে আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা যেতে পারে।
কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যান: ২২ মাসে ২২৬টি
বস্ত্র ও পোশাকখাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী,
- ২০২৪ সালে পোশাকখাতের ৭৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে;
এসব কারখানায় শ্রমিক ছিলেন ৫১ হাজার ৯৬০ জন।
এই সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার্স লিমিটেড, প্রিন্স গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড, রিশাল গার্মেন্টস লিমিটেড, সিও ওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড, শরোজ গার্মেন্টস লিমিটেড, এন. এইচ. ফ্যাশন লিমিটেড, শামসের রেজিয়া ফ্যাশনস লিমিটেড, অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ক্যাভরন লিমিটেড, ডিউ ফ্যাশন লিমিটেড, ঢাকা নিক অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যাশন ট্রেড, এম. আর. অ্যাপারেলস, মাল্টিভার্স অ্যাপারেল প্রাইভেট লিমিটেড, এনআরকে ফ্যাশন লিমিটেড, বার্ডস এ অ্যান্ড জেড লিমিটেড, বার্ডস ফ্যাড্রেক্স লিমিটেড, বার্ডস গার্মেন্টস লিমিটেড ইউনিট–২, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস লিমিটেড, অ্যাক্সন ফ্যাশন লিমিটেড, ডার্ড গার্মেন্টস লিমিটেড, গোল্ডস্টার গার্মেন্টস লিমিটেড, মেরি গোল্ড গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড, ওডিসি ক্র্যাফট প্রাইভেট লিমিটেড, ড্যানিস নিটওয়্যার লিমিটেড, ইক্সোরা অ্যাপারেলস লিমিটেড, লা-মুনি অ্যাপারেলস লিমিটেড, মাহমুদ জিন্স লিমিটেড, নিয়াগারা টেক্সটাইলস লিমিটেড, অল ওয়েদার ফ্যাশনস লিমিটেড, কোস্টালিনো অ্যাটায়ার্স লিমিটেড, ইননার্ট ফেব্রিক অ্যান্ড কুইল্ট লিমিটেড, প্রিন্স জ্যাকোয়ার্ড সুইটার লিমিটেড, এইচএন গার্মেন্টস লিমিটেড, নওসিন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, টিআরজেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ক্রসলাইন ওয়োভেন গার্মেন্টস লিমিটেড, সিয়ার্ক অ্যাপারেলস লিমিটেড, ভাস্ট অ্যাপারেলস লিমিটেড, আবান্তি কালার টেক্স লিমিটেড, ডিজনি সুইটার লিমিটেড, সোনালি ফেব্রিক্স অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলস প্রাইভেট লিমিটেড (সুইটার ইউনিট), ভিবজিওর ফ্যাশন লিমিটেড—ইত্যাদি।
- চলতি ২০২৫ সালে (১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত) বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানার সংখ্যা ১৪৯টি, যা বছরভিত্তিক হিসেবে সর্বোচ্চ।
এসব কারখানা থেকে চাকরি হারিয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৫ পোশাক শ্রমিক
এই তালিকায় রয়েছে—
রাফিন নিটওয়্যারস লিমিটেড, ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স লিমিটেড, যমুনা ফ্যাশন ওয়্যারস লিমিটেড, ফোর ইউ ক্লোদিং লিমিটেড, বেঙ্গল লিজার ওয়্যার লিমিটেড, হেরিটেজ ফ্যাশন, এমকে সন্স লিমিটেড, রিফাত অ্যান্ড সিফাত অ্যাপারেলস লিমিটেড, সানমুন বাংলাদেশ লিমিটেড, ভ্যালেন্টো অ্যাপারেলস লিমিটেড, নিয়ার নিট ফ্যাশন লিমিটেড, ইউরোজোন ফ্যাশন লিমিটেড, এথেন্স ডিজাইন লিমিটেড, মাসকট ফ্যাশনস ও মাসকট গার্মেন্টস, ডায়নাস্টি সুইটার (বিডি) লিমিটেড, শাইনপুকুর গার্মেন্টস লিমিটেড, স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড, হোয়াইট বে অ্যাপারেলস লিমিটেড, ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেড, ব্লেসিং নিটওয়্যার লিমিটেড, ডোরিন ফ্যাশন লিমিটেড, এম.পি. সুইটার্স লিমিটেড, গ্যালাক্সি সুইটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাই লিমিটেড, কেয়া কসমেটিক লিমিটেড (নিট কম্পোজিট ডিভিশন), নেমস অ্যাপারেলস অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড, ভার্চুয়াল নিট অ্যান্ড লিজার ওয়্যার লিমিটেড, তানাজ ফ্যাশনস লিমিটেড, গ্লোবাল অ্যাপারেল পার্ক লিমিটেড, সিজনস ড্রেসেস লিমিটেড, তারাটেক্স ফ্যাশন লিমিটেড, কসমিক সুইটার্স লিমিটেড, ফাইন সুইটার্স লিমিটেড, টিএনজেড অ্যাপারেলস লিমিটেড, স্টিচ মেড লিমিটেড, প্যারাগন ড্রেস লিমিটেড, খানটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেড, রোর ফ্যাশন লিমিটেড, হরাইজন ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড, ডিকেই সুইটার লিমিটেড, হরাইজন লিঞ্জারি লিমিটেড, স্টাইল মোড লিমিটেড, এ.এস.টি. গার্মেন্টস লিমিটেড, টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড, লতিফ নিটিং মিলস লিমিটেড, আদিয়্য অ্যাপারেলস লিমিটেড, ডেলাইট অ্যাপারেল লিমিটেড, হাসনাত টেক্সটাইল লিমিটেড, সারা নিট ওয়্যার, তাশফিয়া এক্সপোর্ট—সহ আরও অনেক কারখানা।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘বিশেষ সুবিধাভোগীর’ পতন
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকার আমলে আর্থিকভাবে ব্যাপক সুবিধাভোগী ছিলেন এমন বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও এই ২২ মাসে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলায় কারাগারে, কেউ আবার ঋণখেলাপি হয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
সংগঠনটির সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক মালিক এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন যে, ব্যাংকের সুদ–আসল, গ্যাস–বিদ্যুৎ বিল ও উৎপাদন ব্যয় মেটাতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ খোলা নেই।
টিকে থাকা না ভেসে যাওয়া?
গ্যাস–বিদ্যুতের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের ঋণ, কঠোর খেলাপি নীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে দেশের পোশাক খাত এখন এক ধরনের ‘বেঁচে থাকার লড়াইয়ে’ নেমেছে।
সংকট উত্তরণে উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানো, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীল নীতি, এবং বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
যথাসময়ে নীতিগত সহায়তা না পেলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হবে—এমন আশঙ্কাই এখন শিল্প ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের।

ইসমাইল হোসেন 






















পবিত্র শবেবরাত আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাতে পালিত হবে