রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার পানি নিরাপত্তা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। নদী–খালের দূষণ, অপর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শহরের পানির মান ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ নামে একটি বৃহৎ প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পটি ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। এতে খাল পুনর্খনন ও পুনর্বাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির পরামর্শক ব্যয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তাবনায় দেখা যায়, পরামর্শকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০৮ কোটি টাকার বেশি, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ২১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি এবং যুক্তিহীন। তাছাড়া সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রস্তাব করায় পরিকল্পনা কমিশনও আপত্তি জানিয়েছে। নানা ত্রুটি ও অসংগতি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনের জন্য এক উপদেষ্টার চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে।
মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’-এর মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে এবং বাকি অর্থ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। চলতি মাস থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে ২০৩১ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে—টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, পানি শোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্রিটমেন্ট প্লান্ট আধুনিকায়ন, নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাপ কমানো, বিকল্প উৎস তৈরি, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালু, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, নদী–খাল দূষণ কমানো এবং পানিবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটিতে বাউনিয়া ও রূপনগর খাল পুনর্বাসন, ফিকাল স্লাজ ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য বাছাই কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকায় দক্ষিণে কাজলা, মৃধাবাড়ি ও জিয়া সড়ক খাল পুনর্বাসন, নতুন গভীর ড্রেন নির্মাণ এবং বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে উন্নত স্যানিটেশন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডে একটি নতুন রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট নির্মাণও অন্তর্ভুক্ত।
নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাল পুনর্বাসনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা ২০ হাজার নতুন নর্দমা সংযোগ স্থাপন, ১৬ কিলোমিটার ইন্টারসেপ্টর লাইন নির্মাণ ও স্লাজ লিফটিং স্টেশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে। তিন সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে ১০টি এসটিএস, একাধিক এমআরএফ স্থাপন, বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা এবং ডিজিটাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো পরামর্শক খাতে ব্যয়। মোট ১৬ ক্যাটাগরির পরামর্শক নিয়োগের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৮০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকার পরও এত বিপুল পরিমাণ পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, খাল পুনর্বাসন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো কাজ স্থানীয় সংস্থাগুলোর নিয়মিত দায়িত্ব, যেখানে বিশেষজ্ঞ পরামর্শকের প্রয়োজন সীমিত। উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক জটিল নকশা না থাকলে এই ব্যয় অনুচিত ও অত্যধিক বলে তারা মনে করেন।
ডিপিপি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরামর্শক খাত ছাড়াও কর্মকর্তা–কর্মচারীর বেতন–ভাতা ও প্রশাসনিক খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ১ হাজার ৩২ কোটি টাকার বেশি।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবটি তৈরি করেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল, যাদের সরকারি প্রকল্প প্রণয়নের অভিজ্ঞতা সীমিত। তাদের প্রস্তাবিত অনেক খাতই প্রকল্পের জন্য অপ্রাসঙ্গিক।
খাল পুনর্বাসনে ব্যয়ের অসংগতি
খাল পুনর্বাসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। ঢাকায় কিলোমিটারপ্রতি খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যেখানে নারায়ণগঞ্জে একই কাজের ব্যয় অর্ধেকেরও কম। ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া ডিপ ড্রেন, এসটিএস পুনর্বাসন, এমআরএফ স্থাপন এবং রিসাইক্লিং প্লান্ট নির্মাণের খরচও তুলনামূলক বেশি ধরা হয়েছে। শুধু যানবাহন কেনাতেই বরাদ্দ ৫৫৩ কোটি টাকার বেশি।
এডিপিতে না থাকা সত্ত্বেও অনুমোদনের তড়িঘড়ি
সাধারণ নিয়মে কোনও নতুন প্রকল্পকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তালিকায় থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত না হয়েও প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে পরিকল্পনা কমিশনের যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের সময় মিলেনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পিইসি সভায় পরামর্শক খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ ও ডিপিপির অসংগতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে খরচ কমানো, অসংগতি সংশোধন এবং ডিপিপি পুনর্গঠন করে পুনরায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা শাখা জানিয়েছে, পরামর্শক খাতের ব্যয় প্রাক্কলনে ভুল ছিল এবং কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সংশোধন চলছে।

ডিজিটাল ডেস্ক 





















পবিত্র শবেবরাত আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাতে পালিত হবে